সোমবার, ০৮ অগাস্ট ২০২২, ০৭:৪১ পূর্বাহ্ন

রায়ে সন্তুষ্ট নিহত রুপার পরিবার, বাসটিও পাবেন তারা

admin
  • Update Time : মঙ্গলবার ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮
  • ১৩২৩ বার পঠিত

গোলাম মোস্তফা, নিজস্ব প্রতিবেদক, সময়ের সংবাদ:
আইন বিভাগের ছাত্রী জাকিয়া সুলতানা রুপাকে চলন্ত বাসে গণধর্ষণ ও হত্যা মামলায় পাঁচ আসামীর সর্বোচ্চ সাজা হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহত রুপার পরিবার। রায়ে খুশি সুশীল সমাজের নেত্রীবৃন্দ ও এলাকার সাধারণ মানুষ। সোমবার টাঙ্গাইল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের ভারপ্রাপ্ত বিচারক এবং অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক আবু মনসুর মিয়া পাঁচ আসামীর চার জনের ফাঁসি, এক জনের সাত বছর কারাদন্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানার রায় ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে রুপাকে যে বাসের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় সেই বাসটির নাম পরিবর্তন করে রুপার পরিবারকে দিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত।
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় রুপার মা হাছনাহেনা বানু বলেন, অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি আর কবরে চির নিদ্রায় সায়িত মেয়ের আত্মার শান্তি কামনায় রোজা রেখেছেন তিনি। রায়ে কি হয় তা শোনার জন্য ফজরের নামাজ আদায় করে মোবাইল ফোনটি পাশে রেখে জায়নামাজেই বসে ছিলেন। বেলা ১১টা ১৩ মিনিটে রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বড় ছেলে হাফিজুর রহমান তাকে জানিয়ে দেন, আসামীদের সর্বোচ্চ সাজা হয়েছে। রায় শোনার পর তিনি চার রাকাত শোকরিয়া নামাজ আদায় করেন। বলেন, যে রায় হয়েছে তাতে আমি খুশি। এখন একটাই চাওয়া ফাঁসির আদেশ কার্যকর করা হোক। এতটুকু দেখে যেতে পারলে মরেও শান্তি পাব।
এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন আর আক্ষেপ করেন, মেয়ে বলত ও পড়াশোনা শেষ করে পরিবারের দায়িত্ব নেবে। মা আর ভাই-বোনদের জন্য সবকিছু করার প্রবল ইচ্ছা প্রকাশ করত। মেয়েকে নিয়ে কত যে আশা ছিল, কত যে স্বপ্ন ছিল তা আর পূরণ হলোনা। পাঁচ ধর্ষক ও হত্যাকারী তা পূরণ হতে দিলনা। তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ রুপাধর্ষণ ও হত্যার বিচারের দাবিতে সরব দেশবাসীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেন।
কথা হয় রুপার ছোট বোন পপির সঙ্গে। বলেন, দুইবোন ছিলাম জোড়া কবুতরের মত। ডানা মেলে উড়তে পারতামনা ঠিকই। তবে মনের আকাশে একসঙ্গে পাখা মেলে ঘুরতাম। পরিবারের সীমাহীন দৈন্যতা থাকার পরও দু’বোনে মিলে আনন্দ আর হই হুল্লুরে মেতে থাকতাম। ভাবতে অবাক লাগে, এখন সেগুলো শুধুই স্মৃতি। পপি আরো বলেন, আপুর মৃত্যুর পর স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনামন্ত্রী মোহাম্মাদ নাসিম বগুড়াস্থ এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানিতে আমাকে অফিস সহকারী পদে চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আমি সেখানেই আছি। যে টাকা বেতন পাই, তা দিয়ে বাসাভাড়া দেওয়ার পর আর তেমন কিছুই থাকেনা। অনেক কষ্টে অসুস্থ মা, ভাই-ভাবি, ভাতিজি নিয়ে চলছে সাত জনের সংসার। এ সময় তিনি এত বড় একটা নৃশংস হত্যাযজ্ঞের রায় মাত্র সাত মাসের মধ্যে ঘোষণা করায় বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর গভীর আস্থা ও সন্তোষ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে চির কৃতজ্ঞতা জানান, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মাদ নাসিমকে, দুঃসময় তার জন্য চাকরির ব্যবস্থা করায়।
রায় শোনার অপেক্ষায় এ দিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন রুপার ভাই হাফিজুর রহমান, উজ্জল হোসেন, বোন জেসমিন খাতুন, পপি খাতুন, ছোট্র ভাতিজি হুমায়রাসহ তাড়াশ উপজেলা নাগরীক আন্দোলনের নেতা আব্দুর রাজ্জাক রাজু। এ নেতা বলেন, দেশে নারী নির্যাতন ও নারী সহিংসতার ক্ষেত্রে রুপা ধর্ষণ ও হত্যা ট্রাজেডি একটা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে তথা আলোড়ন জাগিয়েছে দেশব্যাপী এমনকি দেশের বাইরেও। এর পেক্ষাপটে ছিল আইন কলেজে অধ্যয়নরত এবং কর্মজীবি একজন তরুণীকে নৃশংসভাবে নিপীড়ন ও খুন। এ ঘটনার পূর্ব কোন পটভুমি বা জের ছিল না। তাৎক্ষণিক পাশবিকতা সংঘটন তাও চলন্ত পরিবহণে যা মনুষ্যত্বের চরম লংঘন। এ রায়ের প্রভাবে দেশে নারী নির্যাতনের ব্যাপকতা হ্রাসে নিশ্চিত ছাপ ফেলবে।
রুপার বড় ভাই হাফিজুর রহমান বলেন, দেশে এই প্রথম কোন ধর্ষণ ও হত্যা মামলার আসামীদের সাত মাসে বিচারের রায় দেওয়া হলো। তবে উচ্চ আদালতে আপিল করে ফাঁসির চার আসামী ও সাজা প্রাপ্ত একজন যাতে ছাড়া না পায়, অথবা কোনো ধরনের প্রভাব খাটিয়ে আসামিরা যাতে বের হয়ে যেতে না পারে সেদিকে খেলয়াল রাখার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান তিনি।
সর্বপরি বেশ কয়েকজন সাধারণ মানুষের কাছে এ রায়ের পতিক্রিয়া জানতে চাইলে তারা জানান, পাঁচ আসামীর চার জনের ফাঁসি, এক জনের সাত বছর কারাদন্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে রুপাকে যে বাসের মধ্যে ধর্ষণের পর পৈশাচিকভাবে হত্যা করা হয় সেই বাসটির নাম পরিবর্তন করে রুপার পরিবারকে দিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এমন যুগান্তকারী রায়ে তারা আনন্দিত। এ সময় তারা আরো জানান, রুপা গণধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায়ের মধ্যে দিয়ে দেশের বিচার ব্যবস্থা আবারও বিচক্ষণতা আর নিরপেক্ষতার প্রমান দিল।


২০১৭ সালের ২৫ আগষ্ট বিকেলে বগুড়া থেকে ময়মনসিংহগামী নিরাপদ পরিবহনের ‘ছোয়া’ নামের (ঢাকা মেট্রো ব-১৪-৩৯৬৩) একটি বাসে ওঠেন ২৭ বছর বয়সী রুপা। ময়মনসিংহে এক আত্মীয়ের বাসায় রাত কাটিয়ে পরদিন শেরপুর শহরের কর্মস্থলে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু রুপা আর গন্তব্যে পৌছানো হয়নি। ওই বাসের ভেতর চালক, সুপারভাইজার এবং তিন হেলপার তাকে একে একে ধর্ষণের পর পৈশাচিক কায়দায় খুন করে জানালা দিয়ে বাইরে ছুড়ে ফেলে রক্তাক্ত লাশ। পরিচয় না মেলায় ২৬ আগষ্ট ময়নাতদন্ত শেষে বেওয়ারীশ হিসাবে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করে মধুপুর থানা পুলিশ। এ সময় মধুপুর থানায় ১টি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। এরপর ২৭ আগষ্ট গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি দেখে নিহতের বড় ভাই লাশ সনাক্ত করেন। তার দেওয়া তথ্য মতে ঐদিন দিবাগত রাত ১টার দিকে মধুপর থানা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয় পাঁচ ঘাতক। ২৯ ও ৩০ আগস্ট টাঙ্গাইলের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিট্রেটের আদালত আসামিদের জবানবন্দি রেকর্ড করে তাদেরকে কারাগারে পাঠিয়ে দেন। ৩১ আগস্ট পুলিশ রুপার মরদেহ উত্তোলন করে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন। ঐদিন দিবাগত রাত আটটার দিকে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় রুপার লাশ তার গ্রাম আসানবাড়ি কবরস্থানে দাফন করা হয়।

Please follow and like us:

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর..