সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১, ০৫:০৮ অপরাহ্ন

News Headline :
তাড়াশে শেখ রাসেলের ৫৮তম জন্মদিন পালিত তাড়াশে ছাত্রলীগ নেতা ছোটনের ধুমধামে জন্মদিন পালিত তাড়াশে এমপি আজিজের পূজা মন্ডপ পরিদর্শন তাড়াশে পূজা মন্ডপ পরিদর্শন করলেন আওয়ামীলীগ নেতা শামীম সরকার তাড়াশে ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহেল বাকীর পূজা মন্ডপ পরিদর্শন। তাড়াশে শারদীয় দূর্গা পূজার শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী হান্নান তাড়াশে ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থীর উঠান বৈঠক যেন জনসভায় পরিণত তাড়াশে চেয়ারম্যান প্রার্থীর উঠান বৈঠক যেন জনসভায় পরিণত তাড়াশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে গাছের চারা বিতরণ তাড়াশে নওগাঁ ইউনিয়ন ছাত্রলীগের আনন্দ মিছিল।

আগস্টের একরাত

সময়ের সংবাদ ডেস্কঃ
  • Update Time : শনিবার ১৫ আগস্ট, ২০২০
  • ২৪৭ বার পঠিত

১৫ আগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে ‘আগস্টের একরাত’ নামে উপন্যাস লিখেছেন সেলিনা হোসেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার বেদনাদীর্ণ ঘটনা অবলম্বনে উপন্যাস লেখার পটভূমি বর্ণনা করেছেন ঔপন্যাসিক নিজেই।

২০০৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর একটি অনুষ্ঠানে আমার দেখা হয়েছিল অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাহেবের সঙ্গে। অনুষ্ঠানে আমি আর আনোয়ার এক জায়গায় দাঁড়িয়ে অন্যদের সঙ্গে কথা বলছিলাম। তিনি কাছে এসে বললেন, আপনার কাছে আমার একটি অনুরোধ আছে।

একটি উপন্যাস লেখার জন্য কিছু উপাদান আমি আপনাকে দিতে চাই। আপনি সময় করে হাইকোর্টে আমার অফিসে আসবেন।
কিছুদিন পরে আমি আর আনোয়ার এক দিন হাইকোর্টে অ্যাটর্নি জেনারেল সাহেবের অফিসে গেলাম। তিনি রুমে ছিলেন না। অফিসে যারা ছিলেন তারা বললেন, স্যার এজলাসে। আপনারা বসুন, উনি ১০-১৫ মিনিটের মধ্যেই আসবেন। অল্পক্ষণেই তিনি এলেন। আমাকে দেখে তিনি তার লোককে বললেন, উনার জন্য যে ফাইলটা রেখেছি ওটা নিয়ে এসো।

ছেলেটি সঙ্গে সঙ্গে একটি বড়সড় ফাইল নিয়ে এলো।

তিনি বললেন, এই ফাইলটি হলো বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার সাক্ষীদের জবানবন্দি। ১৫ আগস্ট রাতে কী ঘটেছিল তার বিবরণ এখানে পাবেন। ৬১ জন সাক্ষীর জবানবন্দি। পুরো ফাইল পড়তে যেমন সময় লেগেছে, তেমন চোখ জলে ভরেছে। পড়তে কষ্ট হয়েছে। চোখ মুছে শেষ করতে পারতাম না। তারপর এক দিন শুরু করি লেখার কাজ।

শুরু করেছি এভাবে,

‘রাতের শেষ প্রহর।

বাইরে প্রবল গুলির শব্দ।

চৌচির হয়ে ফেটে যাচ্ছে দিনের প্রথম প্রহর। ’

সাক্ষীদের জবানবন্দি ব্যবহার করেছি একটি অধ্যায়ে। অন্য অধ্যায়ে আছে মৃত মানুষদের চলাফেরা। এভাবে উপন্যাস এগিয়েছে।

একজন সাক্ষীর জবানবন্দিতে সে রাতের ঘটনা এভাবে উঠে এসেছে :

‘আন্দাজি ৫৮ বয়স্ক, হাবিলদার (অব.) কুদ্দুস সিকদার ১০ আইনের বিদানমত শপথ বা প্রতিজ্ঞাপূর্বক আমি কাজী গোলাম রসুল, জেলা ও দায়রা জজ, ঢাকা সমক্ষে অদ্য সন ১৯৯৭ সালের ২৮/৭ তারিখে গৃহীত হইল।

১৯৭৫ সনের প্রথমদিকে শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে মেজর শরিফুল হক ডালিমকে চাকুরি হইতে অব্যাহতি দেওয়া হয়। চাকুরি যাইবার পর মেজর শরিফুর হক ডালিমকে ওই আর্টিলারিতে দেখিয়াছি। ১৯৭৫ সনের জুলাই মাসের শেষের দিকে ওয়ান ফিল্ড রেজিমেন্ট হইতে এক কোম্পানি রেজিমেন্ট ফোর্স ঢাকা গণভবনে এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে ডিউটির জন্য পাঠায়। এ কোম্পানিতে আমিও ছিলাম। ইতিমধ্যে আমি হাবিলদার পদে উন্নীত হই। ক্যাপ্টেন আবুল বাশারের নেতৃত্বে জুলাই মাসের শেষের দিকে আমরা ঢাকা আসিয়া গণভবনে পৌঁছি। ক্যাপ্টেন আবুল বাশার সাহেব আমাদের ডিউটি বণ্টন করিয়া দেন। নায়েব সুবেদার আবুল মোতালেব, হাবিলদার আবদুল গণি, নায়েক আবদুল জলিল, সিপাহী সোরাব হোসেন ও আমি হাবিলদার মো. কুদ্দুস সিকদার ও কয়েকজন এনসিও সিপাইসহ ২৫ জনের একটি দলকে ধানমন্ডিন্থ ৩২ নম্বর রোডে ৬৭৭ নম্বর বাড়িতে অর্থাৎ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে ডিউটিতে পাঠায়।

এই সময় বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দক্ষিণে লেকের দিক হইতে লাগাতার গুলি আসিতে থাকে। তখন আমি এবং আমার গার্ডসহ দেওয়ালের আড়ালে লাইন পজিশনে যাই। গুলি বন্ধ হওয়ার পর পাল্টা গুলি করার জন্য আমার পূর্ববর্তী গার্ড কমান্ডারের নিকট গুলি খোঁজাখুঁজি করিতে থাকি। এই সময় কালো ও খাকি পোশাকধারী সৈনিক হ্যান্ডস-আপ বলিতে বলিতে গেটের মধ্য দিয়ে বাড়িতে ঢুকে। তখন ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা ও মেজর নূর বঙ্গবন্ধুর বাড়ির বারান্দায় আসিয়া সেখানে কামালকে দাঁড়ানো দেখিয়াই ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা হাতের স্টেনগান দ্বারা শেখ কামালকে গুলি করে। শেখ কামাল গুলি খাইয়া রিসেপশন রুমে পড়িয়া যায়। ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা পুনরায় শেখ কামালকে গুলি করিয়া হত্যা করে। ইহার পর ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা ও মেজর নূর বাড়ির পুলিশের ও কাজের লোকদেরকে গেটের সামনে লাইনে দাঁড় করায়। ইহার পর মেজর মহিউদ্দিন তাহার ল্যান্সারের ফোর্স লইয়া গুলি করিতে করিতে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দোতলার দিকে যায়। তারপর ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা ও মেজর নূর কয়েকজন ফোর্স লইয়া বাড়ির বারান্দা দিয়া দোতলার দিকে যায়।

এই সময় আমাদেরকে তাহাদের সঙ্গে যাইতে হুকুম দিলে আমি তাহাদের পেছনে পেছনে যাই। ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা ও মেজর নূর সিঁড়ি দিয়া চৌকির ওপরে গেলে মেজর মহিউদ্দিন ও তাহার সঙ্গীয় ফোর্সকে বঙ্গবন্ধুকে নিচের দিকে নামাইয়া আনিতে দেখি। আমি ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা ও মেজর নূরের পেছনে দাঁড়ানো ছিলাম। এই সময় মেজর নূর ইংরেজিতে কী যেন বলিলেন। তখন মহিউদ্দিন ও তাহার ফোর্স এক পাশে চলিয়া যায়। এই সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, তোরা কী চাস? এরপরই ক্যাপ্টেন হুদা ও মেজর নূর হাতের স্টেনগান দ্বারা বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে। সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু সিঁড়ির মধ্যে পড়িয়া মৃত্যুবরণ করেন। তখন বঙ্গবন্ধুর পরনে একটা লুঙ্গি, গায়ে পাঞ্জাবি, এক হাতে সিগারেটের পাইপ, অন্য হাতে দেশলাই ছিল। অতঃপর মেজর মহিউদ্দিন, মেজর নূর, ক্যাপ্টেন বজলুল হুদাসহ সবাই নিচে নামিয়া আসিয়া দক্ষিণ দিকে গেটের বাহিরের রাস্তায় চলিয়া যায়।

কিছুক্ষণ পরে মেজর আজিজ পাশা, রিসালদার মোসলেহউদ্দিন ও ল্যান্সারের ফোর্স এবং টু-ফিল্ড আর্টিলারির ফোর্স গেটের সামনে আসে। তারপর মেজর আজিজ পাশা তাহার ফোর্স লইয়া গেটের মধ্য দিয়া বাড়ির দোতলার দিকে যাইতে থাকে। আমিও তাহাদের পেছনে পেছনে যাই।

তারপর মেজর আজজি পাশা তার ফোর্সসহ দোতলায় বঙ্গবন্ধুর রুমের দরজা খোলার জন্য বলে। দরজা না খুলিলে দরজায় গুলি করে। তখন বেগম মুজিব দরজা খুলিয়া দেন। দরজা খুলিয়া বেগম মুজিব রুমের ভেতরে থাকা লোকদের না মারার জন্য কাকুতি মিনতি করেন। কিন্তু তাহার কথা না রাখিয়া একদল ফোর্স রুম হইতে বেগম মুজিব, শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও একজন বাড়ির চাকরকে রুম হইতে বাহির করিয়া নিয়া আসে। বেগম মুজিব সিঁড়ির নিকট আসিয়া শেখ মুজিবের লাশ দেখিয়া কান্নায় ভাঙ্গিয়া পড়েন। এরপর বেগম মুজিবকে পুনরায় বঙ্গবন্ধুর বেডরুমে নিয়ে যায়। মেজর আজিজ পাশা, রিসালদার মোসলেহউদ্দিন হাতের স্টেনগান দ্বারা বঙ্গবন্ধুর বেডরুমে থাকা সবাইকে গুলি করে।

তাহার পর তাহারা নিচে চলিয়া আসে। আমিও তাহাদের পেছনে চলিয়া আসিয়া রিসেপশনের বাথরুমের মধ্যে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় শেখ নাসেরের লাশ দেখি। এরপর গেটের সামনে লাইনে সাদা পোশাক পরিহিত একজন পুলিশের লাশ দেখি। তারপর মেজর আজিজ পাশা গেটের বাহিরে গিয়া ওয়ারলেসে কথাবার্তা বলে। কথা বলিয়া গেটের সামনে আসে। তখন শেখ রাসেল তাহার মায়ের কাছে যাইবে বলিয়া কান্নাকাটি করিতেছিল। মেজর আজিজ পাশা ল্যান্সারের একজন হাবিলদারকে হুকুম দিলেন, শেখ রাসেলকে তাহার মায়ের কাছে নিয়া যাও। ওই হাবিলদার শেখ রাসেলের হাত ধরিয়া দোতলায় নিয়া যায়। কিছুক্ষণ পর দোতলায় গুলির আওয়াজ ও কান্নাকাটির চিৎকার শুনিতে পাই। তারপর ওই হাবিলদার নিচে গেটের কাছে আসিয়া মেজর আজিজ পাশাকে বলে, স্যার সব শেষ। এরপর গেটের সামনে একটা ট্যাংক আসে। মেজর ফারুক সাহেব ওই ট্যাংক হইতে নামিলে মেজর আজিজ পাশা, মেজর নূর, মেজর মহিউদ্দিন, ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা তাহার সহিত কথাবার্তা বলে। তারপর মেজর ফারুক ট্যাংক নিয়া চলিয়া যায়।

কিছুক্ষণ পরে একটা লাল কারে করিয়া কর্নেল জামিলের লাশ বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ভেতর লইয়া যায়।

যাইবার সময় মেজর হুদা আমাকে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে পড়িয়া থাকা লাশ রক্ষণাবেক্ষণসহ গোটা বাড়ির দায়িত্ব দিয়া যান। আমিসহ ৮ জন ওই বাড়িতে ডিউটিতে থাকি। জুমার নামাজের পূর্বে ক্যাপ্টেন আবুল বাশার সাহেবকে গেটের সামনে দেখি। ওই দিন গিয়া রাতে মেজর হুদাকে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে দেখি। তিনি আমাকে মোহাম্মদপুর শের শাহ রোডে একটি কাঠের আড়তে লইয়া যান। সেখানে মেজর বজলুল হুদা কাঠের দোকানদারকে ১০টি লাশের কাঠের বাক্স বানাইয়া দিবার জন্য বলে এবং বাক্সগুলি বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর রোডস্থ বাড়িতে পৌঁছাইয়া দিতে বলে। সেখান হইতে মেজর বজলুল হুদা আমাকে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে নামাইয়া দিয়া চলিয়া যান। ’

পরের অধ্যায় আমি এভাবে লিখি :

‘বঙ্গবন্ধু এখন মরদেহ।

ভূখণ্ডের মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর শরীরটির নান্দনিক শিল্প এখন আশ্চর্য নীরবতায় মহাকালের খেরোখাতায় ভরে ওঠার জন্য অপেক্ষমাণ। নিথর শরীরও যে কত বাঙ্ময় হতে পারে ৩২ নম্বর বাড়ির সিঁড়িতে শায়িত তাকে না দেখলে কেউ বুঝতে পারবে না। প্রাণস্পন্দনে কাল্লোলিতহীন শরীর থেকে প্রবাহিত হচ্ছে রক্ত।

কিছুক্ষণ আগে কতিপয় ঔদ্ধত্য সেনা সদস্যের আঠারোটি গুলি তার শরীরকে বিদ্ধ করেছে। গুলির প্রতিটি ক্ষত থেকে তিনশত নদীর মতো বেরিয়ে আসছে রক্ত। যেন ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে তিনশত নদী। প্রতিজ্ঞার মতো উচ্চারণ করছে, বঙ্গবন্ধু আপনার রক্তের স্রোতকে আমরা বুকে করে নিয়ে যাব সাত-সমুদ্র তের নদীর পথে।

তার শরীর এখন আর বত্রিশ নম্বর বাড়ির সিঁড়িতে নেই। এই শরীর ক্রমাগত বিস্তৃত হয়েছে, দীর্ঘায়িত হয়েছে। ঢেকে দিয়েছে বাংলাদেশের সবটুকু জমিন। প্রতিটি গ্রাম, শস্যক্ষেত, কুঁড়েঘর, মেঠোপথ, খেলার মাঠ, শহর, রাজপথ, অলিগলি, শহরতলি, দালানকোঠা, ফলের বাগান, টিলা-পাহাড়, বনভূমি কোনো জায়গাই বাদ নেই। যে কেউ যেকোনো জায়গায় হাত রাখলে ছুঁতে পারে তার তর্জনী, কিংবা পায়ের বুড়ো আঙুল, হাতের কড়ে আঙুল, চোখ, নাক, বুক, পিঠ, চুল-শরীরের সবটুকু।

ডায়েরির পাতায় তিনি লিখেছেন, একজন মানুষ হিসাবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসাবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।

তখন টুঙ্গিপাড়ার ফসল-কাটা ধানক্ষেতে দাঁড়িয়ে কাঁদছে মান্নান শেখ। কাঁদতে কাঁদতে বলছে, বন্ধু ছোটবেলায় তোমার সঙ্গে খেলাধুলা করে বড় হয়েছি। তোমার বড় হওয়া আমি দেখেছি বন্ধু। ভালোবাসাই তোমার জীবনের সবটুকু। সেই ভালোবাসা তুমি দুঃখী মানুষের জন্য অকাতরে দিয়েছো।

তখন চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহানন্দা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকে গফুর মিয়া। দুহাতে চোখ মুছলেও চোখের জল শেষ হয় না। কাঁদতে কাঁদতে বলে, তোমার রাজনীতি আমি ছুঁয়ে দেখেছি নেতা। তোমার ভালোবাসা আমাকে ভিজিয়ে রাখে। আমি রাজনীতির সরল মানে বুঝি। তোমাকে দেখেই বুঝতে পেরেছি রাজনীতি মানে দুঃখী মানুষের সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগ করা।

তখন কিশোরগঞ্জের হাওরের জেলে সুখেন দাস কাঁদতে কাঁদতে বিল থেকে জাল তুলতে ভুলে যায়। চোখের জলে ওর চারপাশ অন্ধকার হয়ে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে বলে, বন্ধু তোমার ভালোবাসা আমাকে ধর্মের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়। মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার মর্যাদা দেয়। আমি হাওরের জলে মাছ ধরে আনন্দে দিন কাটাই।

তখন ঢেঁকির ওপর দাঁড়িয়ে কেঁদে কেঁদে চোখ ফোলায় বরগুনার ডৌয়াতলা ইউনিয়নের লুৎফা বেগম। ঢেঁকিতে পাড় দেয়া হয়ে ওঠে না। একসময় আঁচলে চোখের পানি মুছে বলে, সোনা ভাই আমার তোমার ভালোবাসা পেয়েছি বলেই তো আমাদের ঘর-দুয়ারে শান্তি আছে। তুমি হাজার হাজার বছর বেঁচে থাকো সোনা ভাই।

তখন ইউকে চিং মারমা, বীরবিক্রম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন বান্দরবানের লাঙ্গিপাড়া গ্রামে। পাহাড়ের পাদদেশে নিজের বাড়ির ছোট ঘরে। ঘরের বেড়ার সঙ্গে লাগানো ছিল তার যৌবন বয়সের ছবি যে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা একজন যোদ্ধা। ইউকে চিং সেই ছবির দিকে তাকিয়ে বলেন, তোমাকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে ফিরিয়ে আনার ভাবনায় আমি একজন পাকিস্তানি সেনাকে ভারতীয় ফোর্সের কাছে হ্যান্ডওভার করেছিলাম প্রিয় মুজিব। আজ তোমার দেশের মানুষের কাছে তোমার এমন নৃশংস মৃত্যু হলো কেন? ওরা নিশ্চয় অন্য কোনো দেশ থেকে আসেনি? ওরা কারা? ওরা কি এ দেশের মানুষ না?

স্তব্ধ হয়ে থাকা ইউকে চিং নড়ে ওঠে। ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ায়। অরণ্য পাহাড়ের প্রকৃতির মাঝে বড় হওয়া মানুষটি নিজেকেই বলে, ইপিআর-এ যোগ দেয়ার আগে আমি সমতলের মানুষের সঙ্গে মিশিনি। ওদের ভালো করে জানতাম না। তারপর আস্তে আস্তে জানতে শুরু করি। দেশের নেতাকে চিনতে শুরু করি। তার ৭ মার্চের ভাষণ শুনেছি।

প্রিয় মুজিব, যুদ্ধের পরে আমাকে বীরবিক্রম খেতাব দেয়া হয়। আমি গর্বিত। এই খেতাব আমার অহংকার।

তোমার বিদায়ের দিনে আমি তোমাকে স্যালুট করছি, প্রিয় মুজিব।

ইউকে চিং বীরবিক্রমের মনে হয় তার কথাগুলো পাহাড়ের গায়ে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তার জীবনের স্মরণীয় স্মৃতি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ।

তখন এলিফ্যান্ট রোডের বাড়ির পড়ার টেবিলে বসে চোখের জলে বুক ভাষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইদুর রহমান। ভাবে এই ধারাটি তার বুক ভিজিয়ে দিলে সে ভাবতে পারবে ইতিহাসের মানুষ হারানোর মূল্য কী! তিনি পাকিস্তানি শাসনের ইসলামপন্থি অর্গল ভেঙে তার জীবনে বাঙালিত্বের সত্যকে স্থায়ী করেছিলেন। গণমানুষের জন্য কিছু করার আকাক্সক্ষাকে পূর্ণ করে দিয়েছিলেন। এই ভাবনার জন্য তাকে আর কোনোদিকে তাকাতে হয়নি। তখন নিজের কণ্ঠস্বর শুনতে পায় ঘরের চারদিকে, তুমি আমাদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু। মানুষের প্রতি ভালোবাসা ছাড়া রাজনীতি অর্থবহ হয় না, এ সত্য তোমার চেয়ে কে বেশি বুঝেছে বঙ্গবন্ধু। তুমি জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়াওÑ তুমি দাঙ্গাবিধ্বস্ত জনপদে নিজের জীবন বিপন্ন করে ছুটে যাও। মানুষের মর্যাদাকে তুমি ধর্মের বাইরে নিয়ে যাও। এমন মানুষ একটি জাতির সামনে না থাকা বড়ই মর্মান্তিক।

সাইদুর রহমান দুহাত টেবিলে রেখে তার ওপর মাথা রাখে। তার বুকের ভেতরের দীর্ঘশ^াস বাতাস ঘনীভূত করে। তার সঙ্গে যুক্ত হয় শূন্যতার হাহাকার। টেবিলের সামনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। রাস্তাঘাট প্রায় শূন্য। ছুটে যায় আর্মির গাড়ি। কালো পোশাকধারী সেনারা হা-হা উল্লাসে মেতে থাকে। সাইদুর রহমান চিৎকার করে বলতে থাকে, তোমার আয়ু আমাদের জীবনে অক্ষয় হোক। তুমি হাজার হাজার বছর বেঁচে থাকবে। আমরা জানি তোমার মৃত্যু নেই। তোমাকে মেরে ফেলা কি এত সহজ কাজ। ’

এভাবে উপন্যাসে নানা কিছু যুক্ত হয়েছে। একটি অধ্যায়ে বিশ্বের নেতাদের নিয়ে এসেছি বঙ্গবন্ধুর কফিনের পাশে। তারা তাকে স্মরণ করেছেন। কফিনের ওপর রেখে গেছেন ফুল। বলতে পারি এ উপন্যাস মোহগ্রস্ত কষ্টের সৃষ্টি।

Please follow and like us:

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর..