সোমবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২১, ০১:৫৮ অপরাহ্ন

News Headline :

সিঙ্গাপুরের গবেষণা এবং বাংলাদেশের দিবাস্বপ্ন

সময়ের সংবাদ ডেস্ক
  • Update Time : বুধবার ২৯ এপ্রিল, ২০২০
  • ১৩৫ বার পঠিত

মাসুম পারভেজ, বিশেষ প্রতিনিধিঃ

গত দুই দিন ধরেই এই একটা সংবাদ বাংলাদেশের সব গনমাধ্যমে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে “মে মাসেই বাংলাদেশ থেকে করোনার বিদায়: সিঙ্গাপুরের গবেষণা”। ঐতিহাসিকভাবে গবেষণায় উদাসীন আমার দেশে হঠাৎ এই বিজ্ঞানপ্রেমে খুশী হবার কথা থাকলেও, হতে পারলাম না। সঠিক অনুধাবন ছাড়াই যোগাযোগমাধ্যমে ফলাও করে এরকম ত্রুটিপূর্ন একটা গবেষণাকে দেশজূড়ে মোটাদাগে প্রচার করাটা অনেকটাই খাল কেটে কুমীর আনার মত, ব্যপক বিপর্যয়ের নিয়ামক । কিভাবে ?

প্রথমে আসি গবেষণাটা কেনো গ্রহনযোগ্য না ?

১। প্রথমত বলে রাখতে হয় যে গবেষণাটি কিন্তু কোন পিয়াররিভিউড জার্নালে প্রকাশিত না, SUTD Data-Driven Innovation Lab এর নিজস্ব পোর্টালে প্রকাশিত, অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক পরিপ্রেক্ষিত থেকে এখনো জাস্টিফাইড না। শিক্ষানবীশ,ছাত্র থেকে গবেষকরা নিছক অনুশীলন কিংবা শখের বসে একটা মডেল তৈরী করতেই পারেন, আমরা নিজেরাও করে থাকি, কিন্তু সঠিক পর্যবেক্ষন ছাড়া এগুলোকে কোনভাবেই মোটাদাগে প্রয়োগ করা যাবেনা, ভবিষ্যৎবানী হিসেবেও চালিয়ে দেয়া যাবেনা। কেন?

২। এ মডেলগুলো তৈরী হয় এসাম্পশ্ন তথা অনুমানের ভিত্তিতে। ডাটা সাইন্স,এপিডেমিওলজীতে নিয়মিতভাবে সিমুলেশন মডেল নিয়ে কাজ করা হয়ে থাকলেও এর মধ্যে কেবলমাত্র হাতে গোনা কিছুই গ্রহনযোহ্যতা পায়। অনুমানের গ্রনযোগ্যতা এরকম মডেলের প্রধান অন্তরায়। আলোচিত এই মডেলটাও এরকম অনেকগুলো অগ্রনযোগ্য মডেলের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। যেমন –

তারা বলেছেন “In particular, the model assumes a constant population, uniform mixing of the people, and equally likely recovery of infected”. অর্থাৎ বিশ্বের সর্বত্র মানুষের মেলামেশা অভিন্ন। এখন চীনের লকডাউনের সাথে যদি সুইডেনের নন-লকডাউন কিংবা বাংলাদেশের আংশিক লকডাউন গুলিয়ে ফেলা ব্যপারটা অনেকটাই ভজঘট হবেই।

এই মডেলের এসাম্পসনের সুরে সুইডেন, বাংলাদেশ, এবং সোমালিয়ার সব মানুষ একই হারে আক্রান্ত হবেন এবং রোগমুক্তি পাবেন। তারা ভুলে গেছেন যে রোগের গতিবিধি, আউটকাম অনেকগুলো ফ্যাক্টরের উপরে নির্ভর করে, এব্যপারে কথা বলতে গেলে একটা বই লেখা ! একবার নিজেরাই ভাবুন যেদেশগুলোর গড় আয়ু যথাক্রমে ৮২, ৭৬, ৫৪ , স্বাস্থ্যব্যবস্থার আকাশ পাতাল তফাৎ,সার্বিক পরিচ্ছন্নতার বিশাল তারতম্য, সেখানে এ হারগুলো কিভাবে একরকম হবে?

৩। সার্বিকভাবে কোভিড১৯ নিয়ে এপিডেমিওলজিক্যাল গবেষণাগুলোর সবচেয়ে বড় অন্তরায় হচ্ছে রিপোর্টিং, আর এই লুপহোলের উপরেই কিন্তু আলোচ্য গবেষণাটির SIR (Susceptible-Infected-Recovered) Model নির্মিত। এখানকার উদাহরন দেই,

সুইডেনে শুরু থেকেই হালকা সর্দিকাশী নিয়ে রোগীদেরকে বাসায় থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। সেক্ষেত্রে তারা কিন্তু আক্রান্ত হলেও রিপোর্টিংএর আওতার বাইরে, আর যারা এসিম্পটোমেটিক, তাদের কথা বাদই দিলাম। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই চিত্রটা এরকম। তাই কত জনের মধ্যে কতভাগ আক্রান্ত আর তারমধ্যে কতজন সেরে উঠছেন ব্যপারটা সহজভাবে অনুমান করে নেয়াটা অত্যন্ত অসঠিক।

৪। তাদের গবেষণার আরেকটা অন্তরায় হচ্ছে, তারা ধরেই নিয়েছে রোগের গতি একইভাবে থাকবে লকডাউন কিংবা ইন্টারভেনশান ছাড়া । আমাদের ভুলে গেলে হবে না, সংক্রমন কমে গেলেও ইন্টারভেনশান তুলে ফেললে আমরা আবার আগের পর্যায় ফিরে যেতে পারি। শতবর্ষ আগে ১৯১৮-১৯ সালের স্প্যানিশ ফ্লুর কথা কিন্তু ভুলে গেলে হবে না, প্রথমবারের থেকে প্রায় ৫ গুণ বেশি জোড়ে আঘাত হেনেছিলো দ্বিতীয় ওয়েভ।

এবার আসি, যোগাযোগমাধ্যমে এরকম ত্রুটিপূর্ন গবেষণা প্রচারের ঝুঁকি প্রসঙ্গে-

রিপোর্টের প্রথম অংশে তারা নিজেরাই সাফ অক্ষরে ডিস্ক্লেইমার জুড়ে দিয়েছেন যে গবেষণাটি শুধুমাত্র একাডেমিক উদ্দেশ্যে, বিভিন্ন দেশের বাস্তবচিত্রের সাথে মানানসই নয়। যাচাই করে নেবার দায়িত্ব পাঠকের এবং এ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে খুব আশাবাদী হওয়া যাবে না। বরঞ্চ এর উপর ভিত্তি করে অত্যাধিক আশাবাদী হয়ে আমরা যদি কঠোর ব্যবস্থা বন্ধ করে দিলে, হীতে বিপরীত হবার সম্ভাবনা থাকবে।

দুঃখজনকভাবে, যেসব গনমাধ্যম সংবাদটি প্রকাশ করেছেন, তারা কেউ এ ব্যপারে পা বাড়িয়েছেন বলে চোখে পড়েনাই। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে জনস্বাস্থ্যে চিকিৎসক এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি কিন্তু অবিসংবাদিতভাবে গনমাধ্যমের একটা গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা রয়েছে। গনমাধ্যম যেভাবে নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করতে পারে, এর চেয়ে আরো বেশী প্রভাবিত করতে পারে দেশের সাধারন জনগনকে। যক্ষার চিকিৎসা থেকে, টিকাদান কর্মসূচী, পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যপ্রকল্পে গণমাধ্যমের সহস্রনিযুত গৌরবোজ্বল দৃষ্টান্ত আছে আমাদের বাংলাদেশে। কথায় আছে –

A great power comes a great responsibility

ডা. ময়ূখ চৌধুরী
এপিডেমোলজিস্ট
স্টকহোম, সুইডেন।

Please follow and like us:

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর..